ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে! দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল উড়ালসড়কের কাজ শুরু

বার্তা নগর প্রতিবেদকঃ ঢাকার বিমানবন্দর থেকে সাভার ইপিজেড পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়ালসড়ক (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) নির্মাণ করছে সরকার। উড়ালসড়কটি নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি খরচ হচ্ছে প্রায় ৭০৪ কোটি টাকা। দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এ উড়ালসড়কটির জন্য পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে ২৫ সেপ্টেম্বর। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আশুলিয়ার ধউর এলাকায় পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের ঢালাই কাজের উদ্বোধন করেন।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের মাধ্যমে মাটির ধারণক্ষমতা যাচাই করা হবে। পুরো প্রকল্প এলাকায় সব মিলিয়ে ২২টি পরীক্ষামূলক পাইলিং করা হবে, যার প্রথমটি শুরু করা হয়েছে ২৫ সেপ্টেম্বর। এগুলো মূলত উড়ালসড়কটির নকশা প্রণয়ন কাজেরই অংশ। পরীক্ষামূলক পাইলিং শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হবে নির্মাণকাজ।

বিমানবন্দর ইন্টারসেকশন থেকে শুরু হয়ে আব্দুল্লাপুর-আশুলিয়া-বাইপাইল দিয়ে ইপিজেড পর্যন্ত অংশে নির্মাণ করা হবে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। মূল উড়ালসড়কটির দৈর্ঘ্য ২৪ কিলোমিটার। বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে উড়ালসড়কে ওঠানামার জন্য তৈরি করা হবে ১৬টি র্যাম্প বা সংযোগ সড়ক। র্যাম্পগুলোর সম্মিলিত দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ কিলোমিটার। এ প্রকল্পে উড়ালসড়ক ছাড়াও ১৪ কিলোমিটারের বেশি সড়ক নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি নবীনগর এলাকায় নির্মাণ করা হবে ১ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ফ্লাইওভার, ২ দশমিক ৭২ কিলোমিটার সেতু, ৫০০ মিটার ওভারপাস, ইউটিলিটির জন্য ১৮ কিলোমিটার ড্রেনেজ ও ডাক্ট এবং পাঁচটি টোল প্লাজা।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা ও আশুলিয়া-সাভার এলাকার যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখবে এ উড়ালসড়ক। এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে তৈরি করবে আন্তঃদেশীয় সড়ক যোগাযোগের সুযোগ। বিমানবন্দর এলাকায় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সংযুক্ত হবে নির্মাণাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ঢাকা-জামালপুর মহাসড়ক, ঢাকা-মানিকগঞ্জ-তেঁতুলিয়া মহাসড়ক, ঢাকা-মাওয়া-বরিশাল মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে এ প্রকল্প। উড়ালসড়কটি ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট হারে টোল দিতে হবে যানবাহনগুলোকে।

বর্তমানে বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পয়েন্ট পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ চলছে। বিমানবন্দর-বনানী-মগবাজার-কমলাপুর-সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী-কুতুবখালী পর্যন্ত যাবে এক্সপ্রেসওয়েটি। ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি এটির সঙ্গেই যুক্ত হবে। এর ফলে ইপিজেড থেকে বাইপাইল, আশুলিয়া,কামার পাড়া, আব্দুল্লাহপুর, এয়ারপোর্ট, বনানী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর হয়ে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে যানজটমুক্তভাবে চলাচল সম্ভব হবে। ফলে ঢাকা শহরের যানজট বহুলাংশে হ্রাস পাবে। এক্সপ্রেসওয়ে দুটি চালু হলে দেশের উত্তর, পশ্চিম আর দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বাসিন্দারা ঢাকার ভেতরের যানজট এড়িয়ে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে পারবেন।

প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, উড়ালসড়কটি বাস্তবায়িত হলে ফাইন্যান্সিয়াল আইআরআর ও ইকোনমিক আইআরআরের পরিমাণ হবে যথাক্রমে ১৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ এবং ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক বেনিফিট কস্ট রেশিও দাঁড়াবে যথাক্রমে ১ দশমিক শূন্য ৬ ও ১ দশমিক ১৩। জিডিপিতে দশমিক ২১৭ শতাংশ প্রভাব ফেলবে এ উড়ালসড়ক।

জিটুজি পদ্ধতিতে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে অর্থায়ন করছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। ২০১৭ সালে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত হলেও অর্থায়ন জটিলতায় বিলম্বিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঋণ চুক্তি করতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তিটি সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

এদিকে উড়ালপথটির কাজে গতি আনতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারের সেতু বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে ঢাকায় দ্বিতীয় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের এ প্রকল্প।

এক্সপ্রেসওয়েটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। মোট ব্যয় হচ্ছে ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা চীনের এক্সিম ব্যাংক ও ৫ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা জোগান দেবে সরকার। ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনকে (সিএমসি) নিয়োগ করে সেতু বিভাগ। সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকায় তাদের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি বানিয়ে দেয়ার কথা। বাকি টাকা খরচ হবে ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনসহ আনুষঙ্গিক কাজে।

তবে নির্ধারিত মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সেতু বিভাগের প্রকৌশলীরা। তারা বলছেন, কাজটি বাস্তবায়ন করতে অন্তত চার বছর সময় প্রয়োজন। চলতি বছর কাজ শুরু হলে শেষ করতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত লেগে যাবে। অর্থাৎ দুই বছর বেশি সময় লাগবে। এমন অবস্থায় ডিপিপি সংশোধন করে মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক শাহাবুদ্দিন খান। অপরাধ বার্তাকে তিনি বলেন, একনেকে অনুমোদনের পর আনুষঙ্গিক কাজগুলো করতে নির্ধারিত মেয়াদের বেশির ভাগ সময় লেগেছে। এমন অবস্থায় আমরা প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন করে মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়ার জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছি।

প্রকল্প পরিচালক শাহাবুদ্দিন খান আরো বলেন, চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি। তবে আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহের মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তিটি সম্পন্ন হয়ে যাবে। ঋণ চুক্তির পর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। ২৫ সেপ্টেম্বর পরীক্ষামূলক পাইলিং করা শুরু হয়েছে, তা মূলত উড়ালপথটির নকশা প্রণয়নের একটি অংশ।

Share This Post

Post Comment