নবাব এল এল বি: অশীল্পের অশ্লীল সংলাপ

বার্তা ডেস্কঃ বেশ কিছু দিন আগে বিডি নিউজ.২৪ এর ব্লগে নাটক-সিনেমায় চিত্রায়নের আগে পুলিশকে জানুন শিরোনামে একটি ক্ষুদ্র নিবন্ধ লিখেছিলাম। ‘পুলিশ একজন মানুষ ’ নামের একটি নাটকে পুলিশের কর্মপদ্ধতি ও জিজ্ঞাসাবাদকে অতিস্থুলও ভাবে তুলে ধরায় আমার মনে হয়েছিল, নাটকের লেখক যদি পুলিশের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সামান্যতমও জ্ঞান রাখতেন, তিনি একই কাহিনী ভিন্নভাবে লিখতেন। কাহিনীতে নাট্যকারের সদিচ্ছার প্রমাণ পাওয়া গেলেও কেবল পুলিশের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই ঐ নাটকটি আমার কাছে রীতিমতো হাস্যকর ঠেকেছিল।

কিন্তু ঐ নাটকের পরে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্রে কেবল পুলিশ নয়, আমাদের গোটা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা নিয়ে এত বেশি অশ্লীলতা ছড়ান হবে তা আমার কল্পনায় আসেনি। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘নবাবএলএলবি’নামের একটি ঢাকাই ছবি অনলাইন অ্যাপসে রিলিজ হল। এ করোনাকালেও একটি ছায়াছবি নির্মাণ করে আমাদের নির্মাতা ও কলাকুশলীরা আর্থিক ও শারীরিক ঝুঁকি নিয়েছিলেন সেজন্য তারা অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু ধন্যবাদ পাওয়ার পরিবর্তে এ ছবির নির্মাতা ও কলাকুশলীরা এখন ফৌজদারি মামলার ফ্যাসাদে পড়লেন। ছবিটির যে অংশটি নিয়ে আপত্তি উঠেছে তার বর্ণনা হল নিম্নরূপ-

এক নারী নিজ অফিসের বড় কর্তা ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের দ্বারা ধর্ষিতা হয়ে থানায় গেছেন মামলা করতে। থানার দায়িত্বরত পুলিশ সাব ইন্সপেক্টর মামলা রেকর্ডের পূর্বে ভিকটিমের কাছ থেকে ঘটনা শুনে লিখার পূর্বে ভিকটিমকে কিছু প্রশ্ন করে ঘটনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে চাচ্ছেন। বিষয়টি একদিক দিয়ে বিবেচনা করলে খুবই আটপৌরে ধরনের। কেননা যখন কোন বাদী থানায় মৌখিকভাবে এজাহার দিতে যান তখন তাকে প্রশ্ন করে আপাতত প্রকৃত ঘটনা জেনে নেয়াই আইনত নির্দেশ। কারণ এজাহার লিপিবদ্ধ করার সময় পুলিশ অফিসারকে অন্তত পাঁচটি প্রশ্ন যথা- কি, কে, কখন, কোথায়, কিভাবে এর উত্তর জানতে হয়। একই সাথে জানতে হয় অপরাধের সহযোগীদের সম্পর্কেও। এসব প্রশ্নের পরিপূর্ণ উত্তর বাদী বা ভিকটিমকে দিতে হবে এমন কোন কথা নেই। কিন্তু তাকে তার জানামতে সর্বাধিক তথ্য দিতে হবে।

কোন নারী ধর্ষিতা হয়ে থানায় মামলা করতে গেলে মামলার এজাহার লিপিবদ্ধকারী কর্মকর্তা যে শালীনতা বজায় রেখে প্রশ্ন করবেন, এটাই ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রত্যাশা ও পুলিশের সাধারণ অনুশীলন। কিন্তু ‘নবাবএলএলবি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়কারীগণ শালীনতার কোন ধার ধারেননি। পুলিশের এক এসআই চরিত্রের মুখ দিয়ে উচ্চারিত শব্দগুলো এতটাই বিশ্রী ধরনের যে এজাহার রেকর্ড করার সময় পুলিশ অফিসার তো দূরের কথা নারীকেই ধর্ষণের দায়ে দোষারোপকারী কোন নারী বিদ্বেষীও এমন কথা মুখে উচ্চারণ করার মতো নিচুতা প্রদর্শন করবেন না।

সাহিত্য মানুষ ও সমাজের প্রতিচছবি। সাহিত্যিকগণ সমাজও মানুষকে যেমন দেখবেন, যেমনভাবে বিশ্বাস করবেন বা উপলব্ধি করবেন, নাটক সিনেমায় তাদের চিত্রায়ন তেমনিই হবে। কিন্তু এ চিত্রায়ন কিরূপ শৈল্পিক হবে তা নির্ভির করবে শিল্পীর দক্ষতার উপর। ছবি আঁকতে গিয়ে আনাড়ি চিত্রকর যেমন মানুষের ছবিতে সত্যিকার মানুষের চেহারাটাই প্রতিফলিত করতে পারেনা, তেমনি আনাড়ি কাহিনীকারগণও সমাজ ও মানুষ নিয়ে এমন সব গল্প বা কাহিনী তৈরি করে বসেন, যার মিল সমাজের কোন মানুষ বা মানবগোষ্ঠীর মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘নবাবএলএলবি’ চলচ্চিত্রের সংলাপ লেখক ও থানার পুলিশের এমনি একটি প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন যার সাথে বাংলাদেশের পুলিশের কেন পৃথিবীর কোন দেশের পুলিশেরই মিল খুঁজে পাওয়া যাবেনা।

আলোচিত চলচ্চিত্রে পুলিশের পোশাক পরে গণধর্ষণ মামলার ভিকটিমকে থানায় মামলা রেকর্ডের নামে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে সেগুলো কেবল অরুচিকরই নয়, অতি মাত্রায় অশ্লীলও বটে। থানায় মামলা রেকর্ডের ক্ষেত্রে কোন ধর্ষণ মামলার ভিকটিমকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এ জাতীয় কোন প্রশ্ন করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

একথা ঠিক যে, মামলা রেকর্ডের সময় আসামীদের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। যদি জ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তবে তাদের নামও জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু ধর্ষণের অভিযোগ করতে আসা কোন ভিকটিম নারীকে আদিরসাত্মক স্থূল প্রশ্ন করার কোন প্রয়োজন মামলা রেকর্ডকারী অফিসারের থাকতে পারেনা। অথচ চলচ্চিত্রের সংলাপে সেটাকে অপরিহার্য বলেই বর্ণনা করা হয়েছে।

আমার ধারণা মতে, একজন অবিকশিত আইকিউ এর অধিকারী অশিক্ষিত মানুষ যৌনবিষয়ে গল্প করলে যেমন ভাষা ব্যবহার করেন , জাতীয় পর্যায়ে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি ছায়াছবির সংলাপ লিখতে গিয়ে লেখক তার চেয়ে বেশি আদিভাষা ব্যবহার করেছেন। এর কারণ সম্ভাব্য কারণগুলো হতে পারে-

প্রথমত, তিনি প্রকৃতপক্ষেই একজন নিচুমানের কাহিনীকার বা গল্পলেখক, দ্বিতীয়ত, পুলিশের কর্ম পদ্ধতি তথা ফৌজাদরি বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে তার জ্ঞান খুবই সীমিত, তৃতীয়ত, তিনি পুলিশকে অশ্লীলভাবেই উপস্থাপন করতে চেয়েছেন; চতুর্থত, দর্শকদের মনে কিছুটা আদিরস সঞ্চার করে ছবিকে ব্যবসা সফল করার একটা চেষ্টাও তার ভিতর থাকতে পারে।

অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, ছায়াছবিতে পুলিশকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার জন্যই পুলিশ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে পুলিশের চরিত্র নিয়েইতো পূর্বে যেসব নাটক সিনেমা তৈরি হয়েছে ব্যতীক্রম ছাড়া সেগুলোর কোথাও পুলিশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা হয়নি। কিন্তু তারপরও পুলিশের পক্ষ থেকে সেগুলোতে কোন প্রতিক্রিয়া জানান হয়নি। কিন্তু আলোচিত ‘নবাবএলএলবি’ সম্পর্কিত ঘটনাবলী কেবল পুলিশের বিষয় নয়, এটা অশ্লীলতা, স্থূলতা ও দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শনের প্রতিক্রিয়া। সাহিত্য সৃষ্টিতে শিল্পীর স্বাধীনতা অবশ্যই আছে। কিন্তু শিল্পের নামে অশীল্পের অশ্লীলতা প্রদর্শনের স্বাধীনতা কোনভাবেই সমর্থনীয় নয়।

সন্মানিত লেখক এর প্রতি গভীর সন্মান জানিয়ে সংবাদটি প্রকাশিতঃ সুত্রঃ ডি এম পি নিউজ

লেখক

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

এআইজি (প্ল্যানিং এন্ড রিসার্চ-২)

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা

 

Share This Post

Post Comment