বুয়েট হত্যাকান্ড ২৫ আসামির বিচার শুরু

বার্তা ডেস্কঃ বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২৫ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪/১০৯/১১৪ ধারায় অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান। বিচারক বলেছেন, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সাক্ষীদের বক্তব্য ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখতে পাওয়া যায় যে, আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত অভিযোগের স্বপক্ষে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। এসব অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে চার্জ গঠন করা হলো।

একই সঙ্গে ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রাখা হলো। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। হত্যাকাণ্ডের পর তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আদালত বলেছে, এটা পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তরা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে। এজন্য দণ্ডবিধির চারটি ধারায় অভিযোগ গঠন করেছে ট্রাইব্যুনাল। এই অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার বিচার শুরু হলো।

এর আগে গতকাল কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ২২ আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। প্রথমে তাদের হাজতখানায় রেখে পরে আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। এরপর জনাকীর্ণ আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পড়ে শোনান বিচারক। অভিযোগ পড়ে শোনানোর পর ‘দোষী’ না ‘নির্দোষ’ জিজ্ঞাসা করা হলে আসামিরা প্রত্যেকে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে সুবিচার প্রার্থনা করেন। তবে বিচারক তাদের আর্জি খারিজ করে দিয়ে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন।

কোন কোন ধারায় অভিযোগ :মামলার রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে— দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় নরহত্যা, ৩০২ এর ৩৪ ধারা অনুযায়ী হত্যার পূর্বপরিকল্পনা এবং ১০৯ ও ১১৪ ধারায় হত্যায় অংশগ্রহণের অভিযোগ। তিনি বলেন, হত্যার আগে আসামিরা পরিকল্পনা করেছিল যে তারা আবরারকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে এবং মারবে। এক আসামি এ ব্যাপারে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। উদ্বুদ্ধ করার পর তারা সমবেত হয়েছিল। পরে আবরার বাড়ি থেকে ঢাকায় ফিরে এলে তাকে একটি রুমে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার মোবাইল ফোন চেক করা হয় এবং এক পর্যায়ে তাকে মারধর করা হয়। অর্থাত্ আসামিরা যোগসাজশে পরস্পরের সহায়তায় ‘শিবির’ সন্দেহে আবরারের বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

এর আগে গত ২ ও ৯ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি হয়। ২২ আসামি অভিযোগ গঠন থেকে অব্যাহতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। আর রাষ্ট্রপক্ষ সব আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির চারটি ধারায় অভিযোগ গঠনের আবেদন জানায়।

নির্মমভাবে হত্যা : গত বছরের ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের তড়িত্ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গত বছরের ১৩ নভেম্বর বুয়েটের ২৫ ছাত্রের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ।

আসামিদের মৃত্যুদণ্ড চান নিহতের বাবা : এদিকে, ছেলে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ২৫ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চান নিহত আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এই মামলায় সাক্ষীদের অনেকে আছেন যারা বুয়েটের শিক্ষার্থী। তাদের অনেকের বাড়ি দূর-দূরান্তে। তাদের অনেক বন্ধুবান্ধব আছে যারা রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী। আসামি পক্ষের লোকজন তাদের চাপ দিতে পারে। এ জন্য সঠিক সময়ে আদালতে সাক্ষী হাজিরে রাষ্ট্র ও পুলিশ প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা দরকার। প্রত্যেক আসামির যেন সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত হয় সেটাই আমার আবেদন।

যাদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন :বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশারফ সকাল, সদস্য মুনতাসির আল জেমি, সদস্য মুজাহিদুর রহমান, সদস্য হোসেন মোহাম্মদ তোহা, সদস্য এহতেশামুল রাব্বি তানিম, শামীম বিল্লাহ, মাজেদুল ইসলাম, আকাশ হোসেন, খন্দকার তাবাখ্খারুল ইসলাম তানভীর, মাহমুদুল জিসান, মোয়াজ আবু হোরায়রা, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, বুয়েট ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না, আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা, মিজানুর রহমান, শামসুল আরেফিন রাফাত, উপদপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ ও মাহামুদ সেতুর বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মাহমুদুল জিসান এবং মুজতবা রাফিদ পলাতক রয়েছেন। এদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌঁসুলিরা মামলা পরিচালনা করছেন।

আট জনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি : আসামিদের মধ্যে মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, এ এস এম নাজমুস সাদাত এবং খন্দকার তাবাখ্খারুল ইসলাম তানভীর এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

Share This Post

Post Comment