দলের ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে শেখ হাসিনার আহ্বান ”আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন”

বার্তা ডেস্কঃআওয়ামী লীগ সভাপতি  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের সুনাম এবং ঐতিহ্য সমুন্নত রাখার আহবান জানিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, জনগণের প্রতি দলটির দায়িত্ব রয়েছে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ গণমানুষের একটি দল এবং তাঁদের প্রতি এর একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে। কাজেই, আপনাদের সংগঠনের সুনাম এবং ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে এবং এমনভাবে কাজ করতে হবে যাতে এর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’

ধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবম বারের মতো আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আজ সন্ধ্যায় তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে এলে তিনি এ কথা বলেন।আজ সকালে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনা এই উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ এবং ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের টানা নবম বারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হন।আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যারা উড়ে এসে জুড়ে বসে তাদের দেশ ও জনগণের প্রতি কোন দায়িত্ব থাকেনা।গত নির্বাচনে দেশের জনগণ দলের প্রতি যে আস্থা ও বিশ্বাস দেখিয়েছিল তা সমুন্নত রাখার জন্যও প্রধানমন্ত্রী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের প্রতি নির্দেশনা দেন।তিনি বলেন, ‘আপনাদেরকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে হবে এবং দলের ভাবমূর্তিকে ধরে রাখতে হবে।’

তিনি নিজেদের মধ্যে সকল ভেদাভেদ ভূলে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত দলকে শক্তিশালী করারও আহ্বান জানান।প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করার জন্য আপনাদের ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। দল শক্তিশালী হলে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব।’প্রধানমন্ত্রী এ সময় আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল সফল এবং সুশৃংখলভাবে সম্পন্ন করায় সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানান।শেখ হাসিনা তাঁকে দলের সভাপতি পদে পুনঃনির্বাচিত করায় কাউন্সিলরগণকেও শুভেচ্ছা জানান।যেসব জেলায় এখনও সম্মেলন হয়নি তাদের তা দ্রুত সম্পন্ন করাতেও প্রধানমন্ত্রী তাগিদ দেন।এ প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন যে, যদি তারা যথাসময়ে কাউন্সিল অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হন তবে তাদের কমিটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং ‘সিক্রেট ডকুমেন্ট অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’- বইগুলো পড়ার আহবান জানান।তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি এই ঐতিহাসিক বইগুলো যথাযথভাবে এবং মনোযোগের সঙ্গে পড়েন তাহলে অনেক কিছু জানতে পারবেন।’এর আগে, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া নবম বারের মতো আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তনঃ

আওয়ামী লীগের একুশতম জাতীয় কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে দলটির গঠনতন্ত্রে।এর মধ্যে আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগকে সহযোগী সংগঠনের মর্যাদা, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদকে একীভূত করা, সহসম্পাদকের পদ বাদ দেয়া, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ৪১ থেকে ৫১-তে উন্নীত করা অন্যতম। এছাড়া গঠনতন্ত্রের আরও বেশকিছু বিষয় যুগোপযোগী করেছে ক্ষমতাসীন দলটি।

শনিবার (২১ নভেম্বর) কাউন্সিলের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে গঠনতন্ত্র সংশোধন উপকমিটির প্রস্তাবকৃত গঠনতন্ত্র উপস্থাপন করেন দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে তা সর্বসম্মতিতে অনুমোদিত হয়।গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, আওয়ামী মহিলা লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, তাঁতী লীগ, যুব মহিলা লীগ সহযোগী সংগঠন হিসেবে বিবেচিত। এখন গঠনতন্ত্র সংশোধন করে মৎস্যজীবী লীগকে সহযোগী সংগঠনের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।এছাড়া আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদকে একীভূত করে নতুন নাম দেয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ।জাতীয় শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হবে বলে গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।উপদেষ্টা পরিষদের আকার বাড়ানো হয়েছে আওয়ামী লীগে। আগের গঠনতন্ত্রে ৪১ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ ছিল। গঠনতন্ত্রের ২৬(১)ক ধারা সংশোধন করে তা ৫১ সদস্যের করা হয়েছে।২৬(১)গ ধারা সংশোধন করে মহানগর, জেলা, উপজেলা ব থানা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগেও উপদেষ্টার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। মহানগর ও জেলায় ২১ থেকে বাড়িয়ে ২৭ জন, উপজেলা বা থানায় ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২১ এবং ইউনিয়নে ১১ থেকে বাড়িয়ে ১৫ জন করা হয়েছে।২৫(১)(চ) ধারায় বিভাগীয় উপকমিটি ধারা সংশোধন করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির ৫ জন সহসম্পাদকের যে পদ ছিল তা বাতিল করা হয়েছে।এছাড়া ২৮(২) ধারার স্থানীয় সরকারের স্তরের সংখ্যা বাড়ানো হয়। পৌরসভার সংখ্যা ৪৯১ থেকে ৪৯২ এবং ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪,৫৪৫টির স্থলে ৪,৫৬৯টি লেখা হয়েছে।একই সঙ্গে পরিশিষ্ট অংশে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ ফরমে ব্যক্তিগত তথ্যের জায়গায় নাম, মাতার নাম, পিতা/স্বামীর নাম, পেশা, বয়সের সঙ্গে নতুন করে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল ও ইমেইল যুক্ত করা হয়েছে।২১ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘শ্রমজীবী সমাজের দুর্বল অনগ্রসর, শোষিত, বঞ্চিত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে মানবেতর জীবন হইতে উত্তরণে সার্বিক সহায়তা প্রদান। পঙ্গু, অসহায়, বিধবা, দরিদ্র বয়স্ক, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাসহ সকলের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।’ সেখানে ‘স্বামী পরিত্যক্ত’ ও ‘হিজড়া’ যুক্ত করা হয়েছে।সদস্যপদ অনুচ্ছেদের ৫ নং ধারার ১ নং উপধারায় আছে, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অখণ্ডতা, জাতীয় সংহতি, রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও জননিরাপত্তাবিরোধী এবং হিংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত রহিয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান নহে।’সেখানে ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ যুক্ত করা হয়েছে। ৪ উপধারায় সংগঠনের সর্বস্তরে মহিলা প্রতিনিধিত্ব প্যারায় ২০২০ সালের মধ্যে সব স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব সংরক্ষিত রাখার কথা বলা আছে। সেটা সংশোধন করে ২০২১ সালের মধ্যে করার কথা বলা হয়েছে।গঠনতন্ত্রের অঙ্গীকার অনুচ্ছেদের ১০ উপধারায় বলা আছে, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ : জঙ্গিবাদ সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন।’সেখানে এর সঙ্গে ‘মাদক’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের ১৭ উপধারায় বলা আছে, ‘খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতার ধারা অব্যাহত রেখে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা তথা ভাতের অধিকার নিশ্চিত করা। কৃষিপণ্যের লাভজনক দামের নিশ্চয়তা বিধান।’নতুন করে এখানে ‘পুষ্টিমান’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের অবশ্য পালনীয় দিবসগুলোর যে তালিকা আছে তাও এবার গঠনতন্ত্রে যুক্ত করা হয়েছে।

Share This Post

Post Comment

%d bloggers like this: