কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া প্রতারক গ্রেপ্তার

বার্তা ডেস্কঃ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক। থাকেন গুলশান এলাকায়। শিক্ষকতা জীবন শেষে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করলেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলবেন। গুলশান এলাকায় কাওসার নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। কাওসার ওই শিক্ষককে জানালেন, একজন ভারতীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আছেন। তার নাম রামনাথ ঠাকুর। তিনিও বাংলাদেশে একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটি খুলবেন।

যথারীতি কাওসার ওই শিক্ষককে রামনাথ ঠাকুরের কাছে নিয়ে গেলেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে ওই শিক্ষক ২৮ লাখ টাকা দিলেন। একপর্যায়ে ওই শিক্ষকের সঙ্গে তারা পরিকল্পিতভাবে জুয়া খেলে আরো কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেন। এরপর ওই শিক্ষক যখন প্রতারণার বিষয়টি টের পেলেন তখন লজ্জায় বিষয়টি পরিবারের কাছে গোপন রাখেন।

এভাবে এই প্রতারক চক্রটি ভুয়া অফিস বানিয়ে লোভনীয় চাকরি অথবা ব্যবসার প্রলোভনে শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর পল্লবীর ১১ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে প্রতারক চক্রের প্রধানসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন হারুন-অর-রশিদ ওরফে রামনাথ ঠাকুর, সনজ সাহা ওরফে উজ্জ্বল চৌধুরী ওরফে জি মোস্তফা কামাল, শামছুল আলম মজুমদার ওরফে কোপা শামছু ওরফে মিজানুর রহমান, আমিনুল ইসলাম ওরফে আমিন ও মোকসেদুর রহমান আকন ওরফে আল-আমিন। তাদের কাছ থেকে একটি ব্রিফকেস, ১০ টাকার নোটের দুটি বান্ডিল, আট প্যাকেট প্লেয়িং কার্ড, এক ডলার নোটের দুটি বান্ডিল ও সাতটি মুঠোফান জব্দ করা হয়।

প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্যকে শনিবার আগারগাঁওয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মাঈনুল ইসলাম, পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ আবুল কালাম আজাদ ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বশির আহমেদ, মিনা মাহমুদা ও সালাহ উদ্দিন।

সংবাদ সম্মেলনে মাঈনুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত ১২ ব্যক্তি এই চক্রের হাতে প্রতারিত হয়ে প্রায় ছয় কোটি টাকা খুইয়েছেন। তাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব, গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তা, ব্র্যাক ব্যাংকের একজন পদস্থ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাব-রেজিস্ট্র্রার ও চিকিৎসক রয়েছেন। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করা ব্যক্তিদের এরা টার্গেট করে। এরা ৭-৮ বছর ধরে এ ধরনের প্রতারণা করে আসছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব এদের কাছে এক কোটি ৪৮ লাখ টাকা খুইয়েছেন।

গোয়েন্দা সংস্থার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ খান সাড়ে সাত লাখ টাকা, হাবিব ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার ৩৫ লাখ টাকা, খিলগাঁও এলাকায় একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব ২৫ লাখ টাকা, একজন সাব-রেজিস্ট্রার ২৮ লাখ টাকাসহ ১২ জন কমবেশি ছয় কোটি টাকার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

প্রতারিত ব্যক্তিদের সবাই চাকরি থেকে অবসর জীবন কাটাচ্ছিলেন। অবসর জীবনে চাকরি করে শেষ জীবনটা কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছায় এসব ব্যক্তি প্রতারক গ্রুপের হাতে তাদের পেনশনের সমুদয় টাকা তুলে দিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, এই চক্রটি প্রথমে জাতীয় দৈনিকে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে লোভনীয় চাকরির বিজ্ঞাপন দিত। ওই বিজ্ঞাপনে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, আর্মি ও সিভিল অফিসারদের প্রাধান্য দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকে। বিজ্ঞাপন পড়ে চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি হাবিব ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হোসাইন ভূঁইয়া তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এরপর সহযোগীদের মাধ্যমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সেন্ট্রাল রোডের ১০৫ নম্বর বাড়ির দোতলার একটি ভুয়া অফিসে। সেখানে হিন্দি ভাষায় কথা বলা এক ব্যক্তিকে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দেওয়া হয়। তার নাম রামনাথ ঠাকুর। তিনি ভারতীয় নাগরিক। ভারতে তার অনেক ব্যবসা রয়েছে। তাদের গাজীপুরে টেক্সটাইল মিলস ও চট্টগ্রামের খুলশীতে আরো একটি অফিস রয়েছে বলে জানানো হয়।

এরপর কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি স্থাপনের নামে ব্যবসায় অংশীদারির প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের এমডি বানানো হয় ইফতেখার হোসাইন ভূঁইয়াকে। ২-৩ দিন পর ব্যবসার পার্টনারশিপ হিসেবে তিনি ৩৫ লাখ তুলে দেন রামনাথ ঠাকুরের হাতে। টাকা দেওয়ার একদিন পরই ওই প্রতিষ্ঠানের সবার মুঠোফোন বন্ধ পান তিনি। পরে সেন্ট্রাল রোডের ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখেন তারা অফিস ছেড়ে পালিয়েছে।

Share This Post

Post Comment

%d bloggers like this: