শিল্পীর ছোঁয়ায় যেভাবে রূপ পায় প্রতিমা

প্রতিবারই বছর ঘুরে আসে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আর এই পূজাকে ঘিরে উৎসবপ্রেমী মানুষের মধ্যে যেমন রয়েছে ঝাঁঝালো উত্তেজনা, ভক্তি ও আবেগ, তেমনি রয়েছে শ্রমিকের ঘাম ও শিল্পীর শিল্পকলা।

 

যে উৎসবটি বাঙালি হিন্দুদের গেঁথে দেয় আনন্দের এক সুতায়, সেই উৎসবের ইতিহাসের পটভূমি থেকে শুরু করে স্থান, কাল ও চরিত্রের সম্পর্কে অনেকেই অবগত। কিন্তু বর্তমান সময়ে পূজার আকর্ষণীয় দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রতিমা, যার তৈরির পেছনের গল্প অনেকেই জানেন না।

তবে এই প্রতিমা তৈরি থেকে শুরু করে সৌন্দর্য বর্ধন পর্যন্ত সব নিয়েই যেন চলে এক নীরব প্রতিযোগিতা। কারণটা খুবই সহজ, পূজা মণ্ডপে ঘুরতে আসা পরিবারের ছোট থেকে বড় সকল সদস্যই যেন আসীন হন বিচারকের আসনে। সেই সঙ্গে প্রত্যেকেই মেতে উঠেন পছন্দের প্রতিমার প্রশংসা নিয়ে।

যে প্রতিমা নিয়ে মানুষের মাঝে এত উৎকণ্ঠা। কিভাবে নির্মাণ হচ্ছে সেই প্রতিমা? কি তার পেছনের গল্পটি? একি রং তুলির আঁচড়ে শুধুই নিপুণ হাতের দক্ষতা? এমন কিছু বিষয়কে সামনে রেখেই পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে আলাপ হলো প্রবীণ প্রতিমা শিল্পী বলাই পালের সঙ্গে। আর ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে শুরু করলো প্রতিমা তৈরির পেছনের গল্পের দৃশ্যগুলো।

পরিবর্তন ডটকমের সঙ্গে কথার প্রসঙ্গে ‘শিমুলিয়া ভাস্কর শিল্পালয়’ এর স্বত্তাধিকারী বলাই পাল আপন মনেই বলতে শুরু করলেন, ‘প্রতিমা তৈরি করা জন্য আপনাকে বেশ কিছু ধাপে এগিয়ে যেতে হবে। এখানে প্রত্যেকটি ধাপই সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ধাপে সংগ্রহ করতে হবে উপকরণ, তারপর পর্যায়ক্রমে সেগুলোর ব্যবহার। শেষটা হবে প্রতিমার সাজসজ্জায়, তার আগে শেষ মুহূর্তের সৌন্দর্যবর্ধন।’

প্রতিমা তৈরীর উপকরণঃ
কাঠ, তাঁরকাটা, বাঁশ, খড়, দড়ি, এটেল মাটি, বেলে মাটি, পাট, কলাগাছের খোঁল, কাপড়, সিরিশ কাগজ, রং, স্প্রে রং, বিভিন্ন সাইজের তুলি, আলপিন, পাটের চুল, শাড়ি,সাজসজ্জা।

 

উপকরণ তো সংগ্রহ করলেন, এবার পর্যায়ক্রমে এর ব্যবহার-

সর্বপ্রথম প্রতিমার পেছনের কাঠামো তৈরী করতে হবে। সেখানে ব্যবহার হবে কাঠ ও তাঁরকাটা। এরপর ওই কাঠামোতে খুঁটি বাধতে হবে বাঁশ দিয়ে। খড় ও দড়ি দিয়ে বেঁধে প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

এরপর এটেল মাটির সঙ্গে খড় মিশিয়ে প্রতিমার শারিরীক গঠন তৈরি করতে হবে। পরে বেলে মাটির সঙ্গে পাট মিশিয়ে প্রতিমার গঠনে প্রলেপ দিতে হবে। পরে আবারো মাটির প্রলেপ দিয়ে তা মসৃণ করে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে মসৃন করার জন্য কলাগাছের খোঁলের ব্যবহার করতে হবে।

এতটুকু কাজ সঠিক ভাবে সম্পূর্ণ করলেই তৈরিকৃত প্রতিমা রোদে রেখে শুকানো দেয়ার জন্য প্রস্তুত। শুকানোর পর প্রতিমার গায়ের মাটি ফেটে গেলে আবার প্রলেপ দিতে হবে। প্রতিমা শুকানো শেষে শিরিশ কাগজ দিয়ে ঘঁষে আর একটু মসৃণ করে নেয়া দরকার।

 

এবার রং এর কাজ। রং করার ক্ষেত্রে প্রতিমায় সর্বপ্রথম সাদা রং ব্যবহার করতে হবে। এরপরই প্রতিমার দেহ ও মুখমণ্ডলের কারুকার্যের জন্য হলুদ, লাল, সাদা ইত্যাদি রং ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজনে কয়েকটি রংয়ের সংমিশ্রনে নতুন রং তৈরি করে তা ব্যবহার করা যেতে পারে। রংয়ের কাজ হয়ে গেলে প্রতিমা সুনিপূণভাবে ফুটিয়ে তুলতে স্প্রে রং ব্যবহার করতে হবে।

পরবর্তী ধাপে দৃষ্টি দিতে হবে প্রতিমার চোঁখ, নাক, মুখ আর ঠোট সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলার কাজে। প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে কঠিন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সাইজের চিকন তুলি ব্যবহার করতে হবে।

সবশেষে এবার প্রতিমাকে সাজানোর পালা। এ সময় শাড়ি, কাপড়, আলপিন, ধাতব অস্ত্র, অলঙ্কার আর পাটের তৈরী চুল ব্যবহার করতে হবে।

উপকরণ সংগ্রহের স্থান:

প্রতিমা শিল্পীরা প্রতিমা তৈরির উপকরণ নিজেদের সুবিধা মতো দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে থাকেন। তবে বলাই পাল পরিবর্তন ডটকমকে জানান, তিনি মাটি আনেন সাভার থেকে। বাঁশ আনেন নয়াবাজার অথবা কেরাণীগঞ্জ থেকে। চকবাজার থেকে সংগ্রহ করেন খড়, রং, স্প্রে, আলপিন, তাঁরকাটা ও শিরিশ কাগজ। চুল কেনা হয় শাঁখারিবাজার থেকে।

Share This Post

Post Comment

%d bloggers like this: