আহমদ ছফার প্রশ্ন ও অনুসন্ধান

জীবদ্দশায় আহমদ ছফাকে তরুণ সাহিত্যিক ও চিন্তককুল পছন্দ করত; এখনো করে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবীণ বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক সমাজের সমর্থন তিনি বোধ হয় অতটা পাননি। এর এক প্রমাণ এই যে সাহিত্যিক-বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের জন্য যেসব রাষ্ট্রীয়-প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা আছে, ছফার ভাগে তার খুব সামান্যই পড়েছিল। অবশ্য আহমদ ছফা কেন বাংলা একাডেমি বা অন্য অনেক পুরস্কার পাননি, সে প্রশ্ন এখন আর কোনো তাৎপর্য বহন করে না; যেমন তলস্তয়ের নোবেল পুরস্কার না পাওয়া তাঁর সাহিত্যিক বিবেচনার জন্য মোটেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। কিন্তু ছফার ক্ষেত্রে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, প্রাতিষ্ঠানিক-রাষ্ট্রিক স্বীকৃতির অপ্রতুলতার বিচার-বিশ্লেষণ করার অন্য এক তাৎপর্য আছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রভাবশালী বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতাকে যেমন চেনা যায়, ঠিক তেমনি ছফাকেও চিনে উঠতে সুবিধা হয়।

অথচ ছফা যে বাংলাদেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক দিকগুলোতে খুব বৈপ্লবিক কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা নয়। বায়ান্ন-উনসত্তর-একাত্তরনির্ভর বাংলাদেশের মূলধারার বয়ানে তাঁর নিঃসংশয় আস্থা ছিল। উনিশ শতকীয় রেনেসাঁসের গালগল্পে তিনি যথেষ্ট পরিমাণে বিশ্বাস করতেন, যদিও এ ব্যাপারে তাঁর এমন কিছু প্রশ্ন ছিল, যা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক মূলধারায় খুব সুলভ নয়। চিন্তা, রাজনৈতিক তৎপরতা আর পদ্ধতির দিক থেকে তিনি মোটেই মার্ক্সবাদী ছিলেন না; কিন্তু সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং অর্থনৈতিক হালচালের দিকটা বিবেচনার মধ্যে রাখতেন। সাহিত্যই করতেন তিনি; কিন্তু তাঁর সমবয়সী ঢাকার বিপুল-অধিকাংশ সাহিত্যিক তিরিশি নন্দনতত্ত্বের জোয়ারে যেভাবে ভেসে গিয়েছিলেন, ছফার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। সাহিত্যকে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত কোনো নান্দনিক লোকের চর্চা মনে করতেন না। আহমদ ছফার একজন তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষক সলিমুল্লাহ খান একবার বলেছিলেন, ছফা উপন্যাসকে ‘উপন্যাসত্ব’ থেকে মুক্ত করেছেন। কথাটা গভীরভাবে মূল্যবান। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে বর্তমান বিশ্লেষণে কেবল এ কথা বলাই যথেষ্ট হবে যে সাহিত্যচর্চা এবং সাহিত্য-বিবেচনার ক্ষেত্রে ছফার বিশেষত্ব ছিল।

এটুকু বিশেষত্ব যেকোনো সাহিত্যধারা বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বৃহত্তর পরিধির মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যে এঁটে যাওয়ার কথা। ছফা যে আঁটেননি, নানা ধরনের অস্বস্তি তৈয়ার করেছেন, তা থেকে দুটি জিনিস বোঝা যায়। বোঝা যায়, ছফা প্রশ্নাকুল ছিলেন। কিছু প্রশ্ন তিনি তুলেছিলেন, যেগুলো প্রচলিত মিথে বুঁদ হয়ে থাকা কাঠামোর জন্য সুখকর নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ শোচনীয়ভাবে সংকীর্ণ। একমাত্রিক। ভিন্নমতের সামান্য আলামত পেলেই তাকে রুখে দিতে চায়। ঢেকে দিতে চায় অনুল্লেখ আর অস্বীকৃতির চাদরে। অবশ্য ছফা যদি তাঁর এই ভিন্নমতগুলো নিয়ে নীরবে সাহিত্যচর্চা করে যেতেন, তাতে অন্যরা হয়তো খুব একটা গোসসা হতেন না। কিন্তু ছফার ক্ষেত্রে তা হওয়ার নয়। তিনি ছিলেন এ বঙ্গের অতি-তৎপর বুদ্ধিজীবীদের একজন। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার মধ্যে আগুন ছিল, বিরোধ ছিল, আর ছিল দেশ ও জনগোষ্ঠীর জন্য সদা জাগ্রত কল্যাণের বোধ। তাঁর সমস্ত কাজ এবং কথা অবিমিশ্র সত্য আর সততার আকর—এমন কোনো সিদ্ধান্ত প্রচার করা আমাদের লক্ষ্য নয়। কিন্তু ছফার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার যে আলাদা মেজাজ ছিল, সে কথাটা জোর দিয়ে বলা দরকার।

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রধান লক্ষণ কী? ছফা নিজে একবার এই বুদ্ধিজীবী সমাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন এই বলে যে বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, এখন স্বাধীনতার পরেও তাঁদের মত অনুযায়ী চললে বাংলাদেশের উন্নতি হবে না। তিনি অবশ্য কথাটা তত্ত্বীয়-প্রায়োগিক দিক থেকে ব্যাখ্যা করে বলেননি। কিন্তু তাঁর কথার সারবত্তা অস্বীকার করার জো নেই। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ আরোপিত-বহিরাগত মত ও পথ অনুসারে পরিচালিত হয়। জনগোষ্ঠীর ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে ‘স্বাধীন’ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে বহিরাগত বর্গের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মত জানানোর প্রবণতা এখানে খুবই প্রবল। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চার অপ্রতুলতা এর প্রধান কারণ। চর্চায় ও গবেষণায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের খামতি থাকার কারণে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী-সমাজ খুব সহজেই আরোপিত-বহিরাগত সিদ্ধান্ত ও বর্গের খপ্পরে পড়ে যায়। ছফার কালে এসবের উৎস ছিল অংশত পশ্চিম, আর শ্রেষ্ঠাংশে কলকাতা। একালে কলকাতার ভাগ বোধ হয় খানিকটা কমেছে; কিন্তু ধরনটা খুব বেশি বদলায়নি। ছফা, আগেই বলেছি, অন্য অনেক ব্যাপারের মতো এ ক্ষেত্রেও বিপ্লবী বা আমূল পরিবর্তনবাদী ছিলেন না। কলকাতার সাংস্কৃতিক ভোগ্যপণ্যে বা বুদ্ধিবৃত্তিক মিঠাই-মন্ডায় তিনি কখনো বিরাগ দেখাননি। কিন্তু কলকাতার কারখানায় প্রস্তুত ধারণাগুলো তিনি বাছবিচার না করে হুবহু ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন না। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক পা ছিল ইতিহাসের গভীরে, অন্য পা বর্তমানের বাঁকাত্যাড়া বাস্তবতায়। আমি এখানে আহমদ ছফার ইতিহাস-অনুধ্যানের দুটি মাত্র উদাহরণ দেব।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মবৃত্তান্তের ছোট কিন্তু তীক্ষ্ণ অ্যালিগরি তিনি দাখিল করেছেন তাঁর ওঙ্কার উপন্যাসে। উপন্যাসটির নান্দনিকতা আর রাজনৈতিকতার বয়ান এখানে আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। আমরা শুধু স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাসের একটা ছোট দিকে ছফার মনোযোগের কথা বলব। যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেছিল, যারা পাকিস্তানের তেইশ বছর ক্ষমতার মধু আহরণ করেছিল, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষের লড়াই-সংগ্রামকারীদের পার্থক্য কতটা? কোন কোন স্তরে? পার্থক্যটা কখন সূচিত হয়েছিল? ছফা তাঁর বাস্তব ও কাণ্ডজ্ঞান থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে পার্থক্যটা মৌলিক নয়। তার মানেই হলো, ‘প্রগতি’ ও ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’র বাইনারিতে ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করার যে প্রভাবশালী রেওয়াজ বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি খুবই নড়বড়ে। অন্তত জনগোষ্ঠীর বাস্তব তৎপরতা থেকে তা প্রমাণ করা মুশকিল।

Share This Post

Post Comment

%d bloggers like this: